ডেস্ক রিপোর্ট :: ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ফালডাঙ্গী গ্রামে টানা ভারী বর্ষণের কারণে সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বুকসমান পানি পেরিয়ে এক বৃদ্ধার মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে ছেলে-স্বজনদের। হৃদয়বিদারক এই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান ফালডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ও মফিজউদ্দিনের মা, প্রায় ৮০ বছর বয়সী মফিজান বিবি। বিকেলে জানাজার উদ্দেশ্যে মরদেহ নিয়ে বকুয়া ইউনিয়নের রাজিউন রহমান হাফেজিয়া মাদরাসা মাঠে যাওয়ার সময় চরম দুর্ভোগে পড়েন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা।
ফালডাঙ্গী-নোনা সংযোগ সড়কে কোনো স্থায়ী ব্রিজ না থাকায় আড়াই কিলোমিটার পথের একটি অংশ বুকসমান পানি মাড়িয়ে অতিক্রম করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ছেলের কাঁধে মায়ের মরদেহ তুলে পানির মধ্য দিয়েই কবরস্থানের পথে যাত্রা করতে হয়। ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি কোনো নতুন সমস্যা নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এই এলাকার মানুষ একটি স্থায়ী ব্রিজের অভাবে বছরের পর বছর একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার হয়ে আসছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সড়ক ডুবে গেলে রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং মৃত ব্যক্তির দাফন—সব ক্ষেত্রেই চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়।
এলাকাবাসী জানান, বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে প্রায় ছয় কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হয়। কিন্তু মরদেহ বহনের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হওয়ায় বাধ্য হয়েই পানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন প্রার্থী ব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আর কেউ খোঁজ নেন না। ফলে বছরের পর বছর একই সমস্যার সমাধান হয়নি। সম্প্রতি গ্রামের মানুষ নিজেদের অর্থ ও শ্রম দিয়ে একটি অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করেছিলেন। তবে মাত্র দুদিনের টানা বৃষ্টিতেই সেটি পানির নিচে তলিয়ে যায়।
গ্রামবাসীর দাবি, একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ করা হলে শুধু যাতায়াতই সহজ হবে না, বরং জরুরি চিকিৎসাসেবা, শিক্ষার্থীদের চলাচল এবং মরদেহ দাফনের মতো মানবিক বিষয়েও দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।
এদিকে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নজরে এসেছে প্রশাসনেরও। বিষয়টি নিয়ে হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চন্দন কর বলেন, মরদেহ দাফনের জন্য পানির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার ভিডিও তিনি দেখেছেন এবং ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সড়কে একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
এলাকাবাসীর আশা, এবার আর শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে কাউকে আর বুকসমান পানি পেরিয়ে প্রিয়জনের মরদেহ কবরস্থানে নিতে হবে না।
Leave a Reply